হৃদস্পন্দন যখন হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়: কেন হয় হার্ট অ্যাটাক?
আধুনিক জীবনযাত্রায় আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি শরীরের জটিলতাও বেড়ে চলেছে বহুগুণ। এর মধ্যে অন্যতম মারাত্মক ও আশঙ্কাজনক শারীরিক সমস্যা হলো ‘হার্ট অ্যাটাক’। বিশ্বজুড়ে অসংক্রামক ব্যাধির কারণে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার একটি বড় অংশের জন্য দায়ী এই হৃদরোগ। হঠাৎ করেই একজন সুস্থ-সবল মানুষ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। কিন্তু কেন ঘটে এই ঘটনা?
হার্ট অ্যাটাক আসলে কী?
আমাদের হৃত্পিণ্ড সারা শরীরে রক্ত পাম্প করে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেয়। কিন্তু হৃত্পিণ্ডের নিজস্ব পেশিগুলোকে সচল রাখার জন্যও রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়। এই কাজটি করে ‘করোনারি ধমনি’ (Coronary Artery)। কোনো কারণে এই ধমনির রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে বা হৃত্পিণ্ডের পেশিতে অক্সিজেন সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাকেই চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন’ বা হার্ট অ্যাটাক।
হার্ট অ্যাটাকের প্রধান কারণসমূহ
- রক্তনালিতে চর্বি জমা (Atherosclerosis): হার্ট অ্যাটাকের মূল কারণ হলো রক্তনালিতে ‘প্লাক’ বা চর্বির স্তর জমা। রক্তে অতিরিক্ত পরিমাণে খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) থাকলে তা করোনারি ধমনির দেওয়ালে ধীরে ধীরে জমতে থাকে। ফলে রক্ত চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে যায়।
- রক্তজমাট বাঁধা (Blood Clot): জমতে থাকা প্লাক অনেক সময় ফেটে যায়। তখন শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। এই জমাট বাঁধা রক্ত ধমনি পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে রক্তপ্রবাহ আটকে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়।
- ধমনির খিঁচুনি (Coronary Vasospasm): কখনো কখনো চর্বি জমা ছাড়াও করোনারি ধমনি হঠাৎ তীব্রভাবে সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। ফলে হৃত্পিণ্ডে রক্ত চলাচল থমকে যায়। অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা কোনো বিষাক্ত উপাদানের প্রভাবে এটি হতে পারে।
ঝুঁকির কারণ: কার আক্রমণ বেশি?
চিকিৎসকদের মতে, হার্ট অ্যাটাকের পেছনে কিছু অপরিবর্তনীয় ও কিছু পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি রয়েছে:
১. অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন: অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া, কায়িক পরিশ্রম না করা এবং দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার অভ্যাস হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
২. ধূমপান ও তামাক: ধূমপানের ফলে রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায় এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ে।
৩. উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস: অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ রক্তনালির দেওয়ালে ধকল সৃষ্টি করে এবং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস রক্তের শর্করা বাড়িয়ে রক্তনালিকে দুর্বল করে দেয়।
৪. মানসিক চাপ ও স্থূলতা: অতিরিক্ত মানসিক চাপ শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন হরমোন বাড়িয়ে রক্তচাপ বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন হৃত্পিণ্ডের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
৫. বংশগত কারণ: পরিবারে কারও অল্প বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে এই ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়।
লক্ষণ দেখে সতর্ক হোন
হার্ট অ্যাটাক সবসময় হঠাৎ করে তীব্র ব্যথা নিয়ে আসে না; অনেক সময় এর উপসর্গগুলো বেশ সূক্ষ্ম হয়:
- বুকের মাঝখানে বা বাম দিকে অসহ্য চাপ, যন্ত্রণা বা ভারী ভাব অনুভব করা।
- ব্যথা ছড়িয়ে বাম হাত, কাঁধ, পিঠ, চোয়াল বা পেটের দিকে যাওয়া।
- বুক ধড়ফড় করা, কোনো কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত ঘেমে যাওয়া।
- হঠাৎ শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়া এবং মাথা ঝিমঝিম করা বা বমি ভাব হওয়া।
(উল্লেখ্য, ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে বুকে তীব্র ব্যথা ছাড়াও শুধু অতিরিক্ত ঘাম, ক্লান্তি বা শ্বাসকষ্টের মাধ্যমে ‘সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক’ হতে পারে।)
প্রতিরোধেই মুক্তি
হার্ট অ্যাটাক থেকে বেঁচে থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা শরীরচর্চা করা, খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল ও ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার রাখা এবং অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। এছাড়া ধূমপান সম্পূর্ণ ত্যাগ করা, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়মিত নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বছরে অন্তত একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত।
হার্ট অ্যাটাক কোনো অবধারিত পরিণতি নয়, বরং সচেতনতাই পারে এই প্রাণঘাতী ঝুঁকি থেকে আমাদের হৃত্পিণ্ডকে নিরাপদ রাখতে।

